হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনে ফের নজীর গড়লো মেডিক্যাল, সজলের ধুকপুকুনি নিয়ে বাঁচবেন হবিবর

0
42

মস্তিষ্কে প্রবল রক্তক্ষরণ। বাঁচবে না তাঁদের কুড়ি বছরের ছেলে সজল কর। মানসিক ভাবে এক রকম প্রস্তুতিই নিচ্ছিলেন বাবা-মা। এর পরে ডাক্তারেরা চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার পরেই সন্তান হারানোর শোক অতিক্রম করে সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা। মৃত সজলের অঙ্গ দানের আবেদন করলেন।

Ad

তাঁদের কথা শুনেই হতবাক হয়ে যান সিএমআরআই-এর চিকিৎসকেরা। কারণ এই সব ক্ষেত্রে তাঁদের দিক থেকেই অঙ্গদানের অনুরোধ করা হয় পরিবারকে। শোসন্তপ্ত পরিবারের কাছে সে অনুরোধ প্রায়ই বড় বেশি কঠিন মনে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তো অনুরোধের আগেই সিন্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তাঁরা!

১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান বাইক দুর্ঘটনায় মারাত্মক জখম, দ্বিতীয় বর্ষের কলেজপড়ুয়া সজল। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি হন সিএমআরআই হাসপাতালে। কিছু পরই ভেন্টিলেশনে চলে যান তিনি। ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, সজলের বাঁচার সম্ভাবনা  কার্যত নেই। এর পরেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে নিথর হয়ে যান তরতাজা ওই যুবক। তার পরেই অঙ্গদানের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন সর্বস্ব দিয়েও ছেলেকে বাঁচাতে না-পারা বাবা-মা। ১৯ ডিসেম্বর সকালেই শুরু হয় অঙ্গদানের প্রক্রিয়া। সেই দিনই সজলের অঙ্গে প্রাণ ফিরে পান তিন জন মরণাপন্ন রোগী। সিএমআরআই-সহ দু’টি হাসপাতালে পৌঁছে যায় সজলের হার্ট ও দু’টো কিডনি। যা শহরে মরণোত্তর অঙ্গদানের ঘটনায় অন্যতম নজির বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

সজলের একটি কিডনির গ্রহীতা সিএমআরআই-তেই পাওয়া যায়। ৫-৬ ঘণ্টার মধ্যেই সজলের আরও একটি কিডনি পৌঁছয় অ্যাপোলো হাসপাতালে। সেখানেই আইসিইউ-তে ভর্তি রোগীর শরীরে সজলের কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়। এই একই দিনে ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছয় তার হার্ট। প্রাণে বাঁচেন আরও এক বিপন্ন রোগী। প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শহরের তিনটি হাসপাতালে সফল ভাবে প্রতিস্থাপিত হয় সজলের অঙ্গগুলি। সি কে বিড়লার গ্রুপ সিইও উত্তম বোস জানাচ্ছেন, “অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে নেওয়ায় তিন জনের প্রাণ বাঁচানো গিয়েছে। সজলের মা-বাবার সাহসকে সম্মান জানাচ্ছি। সবাই তাঁদের মতো এগিয়ে এলে অনেক রোগী নতুন করে বাঁচবেন, সুস্থ হবেন। সজলের পরিবারকে আমার স্যালুট।”

মৃত্যুর আগেও বহু বার বহু মানুষের উপকার করেছিলেন সজল। সাত-পাঁচ চিন্তা না করেই বরাবারই মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেন এই কলেজ ছাত্রটি। মৃত সজলের শরীরও তাই ছাই হতে দেয়নি পরিবার। বরং আরও অনেককে বাঁচানোর জন্যই কাজে লাগিয়েছেন। সজলের চোখ শঙ্কর নেত্রালয়ে সংরক্ষিত, লিভারও রাখা আছে এসএসকেএমে। এসএসকেএমের স্কিন ব্যাঙ্কে রাখা হয়েছে সজলের ত্বক।

তবে এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই আরও একটা কৃতিত্বের পালক যোগ হল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ঝুলিতে। এই বছরেই রাজ্যের সরকারি হাসপাতালে হৃদ্‌যন্ত্র প্রতিস্থাপনের প্রথম সূচনা হয়েছে এখানেই। বছর শেষে এল দ্বিতীয় সাফল্য। শুধু তা-ই নয়, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে চলতি বছরে এই নিয়ে ষষ্ঠ হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের পরে রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, হৃদ্‌পিণ্ড প্রতিস্থাপনে সাফল্যের মাইলফলক ছুঁল পশ্চিমবঙ্গ। মে মাসে পূর্ব ভারতে প্রথম হৃদ্‌যন্ত্র প্রতিস্থাপিত হয় আনন্দপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তার পরে অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন শুরু হয়। গত মাসে রাজ্যের প্রথম সরকারি হাসপাতাল হিসেবে সেই কাজ শুরু করে কলকাতা মেডিক্যাল।গ্রিন করিডরে করে সজলের হার্ট আনার পরে, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি, মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা ৪৮ বছরের হবিবর রহমানের দেহে বসল হার্ট। সকালে গ্রিন করিডরের মাধ্যমে আলিপুরের বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হৃৎপিণ্ড পৌঁছয় কলকাতা মেডিক্যালে। শুরু হয় অস্ত্রোপচার। সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ হাসপাতালের সুপার ইন্দ্রনীল বিশ্বাস বলেন, ‘‘অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। রোগী আপাতত সুস্থ। তবে দু’দিন তাঁকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হবে।’ 

এসএসকেএম সূত্রের খবর, এ দিন বারুইপুরের জয়প্রতিম ঘোষের দেহে প্রতিস্থাপিত হয় সজলের যকৃৎ। এসএসকেএমের গ্যাস্ট্রো-এন্টেরোলজিস্ট অভিজিৎ চৌধুরী জানান, জয়প্রতিম সিরোসিস অব লিভারে আক্রান্ত ছিলেন। প্রতিস্থাপন পরে বছর আটত্রিশের ওই যুবক ফের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন। দুই বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, সজলের কিডনি দু’জনের দেহে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। গ্রহীতারা আপাতত সুস্থ। তবে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

কুড়ি বছরের সজলকে তাঁরা এ ভাবেই অন্যদের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে চান বলে জানান তাঁর বাবা সুমিতবাবু। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর পরিবার। তিনি বলেন, ‘‘অন্যের শরীরে এ ভাবেই বেঁচে থাকবে আমার ছেলে।’’ শোক নয়, সজলকে যেন নতুন করে খুঁজে পেয়েছে তাঁর পরিবার। মা জানালেন,  “আমার ছেলে তো বেঁচেই, কত মানুষের প্রার্থনায় সজল আছে, থাকবে।”

ad

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here